তারেক খান: বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের ১২তম প্রয়াণ দিবস আজ। ২০১৪ সালের এই দিনে কলকাতায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে যাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা, সেই সুচিত্রা সেন আজও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছেন। দেশ-বিদেশে তাঁর অসংখ্য ভক্ত আজ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন এই মহানায়িকাকে।
সুচিত্রা সেন একজন ভারতীয় অভিনেত্রী হলেও তাঁর জন্ম বাংলাদেশের পাবনা জেলায়। তাঁর জন্মগত নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত। ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল পাবনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মা ইন্দিরা দেবী ছিলেন গৃহবধূ। তিনি ছিলেন পরিবারের পঞ্চম সন্তান ও তৃতীয় কন্যা। পাবনা শহরেই তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি রজনীকান্ত সেনের নাতনী।
১৯৪৭ সালে বিশিষ্ট শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের একমাত্র কন্যা মুনমুন সেন নিজেও খ্যাতনামা অভিনেত্রী। সুচিত্রা সেনের নাতনী রিয়া সেন ও রাইমা সেনও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন।
চলচ্চিত্র জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয় ১৯৫২ সালে। প্রথম ছবি শেষ কোথায় নির্মিত হলেও সেটি আর মুক্তি পায়নি। ১৯৫৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে অভিনয় করে তিনি রাতারাতি দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেন। এই ছবির সাফল্যের মধ্য দিয়েই বাংলা চলচ্চিত্রে এক অনন্য রোমান্টিক জুটির জন্ম হয়।
সুচিত্রা সেন বাংলা ও হিন্দি—উভয় ভাষার চলচ্চিত্রেই সমানভাবে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত প্রথম হিন্দি ছবি ছিল দেবদাস (১৯৫৫)। টানা ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের পর ১৯৭৮ সালে তিনি চলচ্চিত্র থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে সরিয়ে নেন এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সেবাকর্মে ব্রতী হন।
২০০৫ সালে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মাননা দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য তিনি মনোনীত হন। তবে কলকাতা থেকে দিল্লি গিয়ে সশরীরে পুরস্কার গ্রহণে আপত্তি জানানোর কারণে তিনি এ সম্মাননা গ্রহণ করেননি।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
সুচিত্রা সেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম অভিনেত্রী যিনি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হন। সাত পাকে বাঁধা ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য ১৯৬৩ সালে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। হিন্দি ছবি দেবদাস (১৯৫৫)–এ অভিনয়ের জন্যও তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জন করেন।
উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর রোমান্টিক জুটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও স্মরণীয় জুটিগুলোর একটি। ১৯৬০ ও ১৯৭০–এর দশকে তাঁর অভিনীত অসংখ্য ছবি দর্শকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। স্বামীর মৃত্যুর পরও তিনি অভিনয় চালিয়ে যান। বিশেষ করে হিন্দি ছবি আঁধি–তে একজন নেত্রীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এই চরিত্রটি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী থেকে অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হয়। ছবিটির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে মনোনীত হন।
চলচ্চিত্রজীবন
১৯৫২ থেকে ১৯৭৮—এই ২৬ বছরে সুচিত্রা সেন মোট ৬২টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে অগ্নি পরীক্ষা, গৃহ প্রবেশ, ঢুলি, দেবদাস, শাপমোচন, সাগরিকা, পথে হল দেরী, দ্বীপ জ্বেলে যাই, সপ্তপদী, সাত পাকে বাঁধা, উত্তর ফাল্গুনী, মমতা, গৃহদাহ, দেবী চৌধুরাণী, আঁধি, দত্তা এবং সর্বশেষ ছবি প্রণয়পাশা।
মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা
২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় সময় সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর তিন সপ্তাহ আগে ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
তাঁর মৃত্যুতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গান স্যালুট প্রদানের ঘোষণা দেন। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী-পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী গভীর শোক প্রকাশ করেন।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুচিত্রা সেন এক অনন্য নাম। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।