সন্ধ্যার পরে পাবনার মেরিল বাইপাস-টেবুনিয়া মহাসড়ক হয়ে ওঠে

শেয়ার করুন

সন্ধ্যার পরে পাবনার মেরিল বাইপাস-টেবুনিয়া মহাসড়ক হয়ে ওঠে হ্যারাসমেন্টের ফাঁদ

তারেক খান: সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই পাবনা সদরের মেরিল বাইপাস–টেবুনিয়া মহাসড়ক পরিণত হচ্ছে আতঙ্কের জনপদে। নির্জনতা, পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং পুলিশের নিয়মিত টহলের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে এ সড়কে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ছিনতাই ও হ্যারাসমেন্টকারী একটি চক্র— এমনই অভিযোগ উঠেছে জনসাধারণের কাছ থেকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাবনার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে টেবুনিয়া যাবার পথে মেরিল বাইপাস, রামানন্দপুর, গাছপাড়া, মালিগাছা, টেবুনিয়া ফার্ম সহ কয়েকটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই জনমানবহীন অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই সুযোগে নেশাগ্রস্ত, অস্ত্রধারী কিছু দুষ্কৃতকারী চক্র সংঘবদ্ধভাবে পথচারী, রিকশাচালক ও অটোচালকদের পথ রোধ করে ভয়ভীতি দেখিয়ে ছিনতাই করে। চক্রটির মূল টার্গেট কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া শিক্ষার্থী। সন্ধার পরে যুবক-যুবতীকে একসাথে রিক্সা বা বাইকে দেখলেই চক্রটি কয়েকটি ধাপে মোটরসাইকেল যোগে তাদের ফলো করে। সুযোগ বুঝে একসময় সংঘবদ্ধ হয়ে জনমানবহীন অন্ধকারচ্ছন্ন কোন জায়গায় তাদের পথরোধ করে। প্রথমেই জিজ্ঞেস করা হয় তারা স্বামী স্ত্রী কিনা। স্বামী স্ত্রী না হলেই শুরু হয় হ্যারাসমেন্ট। শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। মানসম্মানের ভয়ে একসময় তারা টাকাপয়সা মোবাইল সব দিয়ে দিতে বাধ্য হয়। অনেকসময় যুবক যুবতীকে আটকে রেখে পরিবারের কাছেও মোটা অংকের টাকা দাবি করে এই চক্র। এদের মধ্যে কেউ কেউ মধুচক্রের সাথেও জড়িত বলে জানা যায়।

পাবনা শহরের সোলাইমান নামে ভুক্তভোগী এক যুবক জানান, প্রায় ১৫ দিন আগে ঊষা নামে এক তরুণী আমার দোকানে রিংলাইট কিনতে আসলে তার সাথে আমার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে ভিডিও ও গ্রাফিক্সের কাজের কথা বলে গত ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার বিকেল ৪ টার দিকে আমাকে মালিগাছা গোরস্থানের সামনে ডাকা হয়। সেখানে পৌঁছালে পুর্ব পরিকল্পিতভাবে কয়েকজন দুষ্কৃতকারী আমাকে মধুচক্রের ফাঁদে ফেলে। সন্ধায় জোরপূর্বক তারা আমাকে গোরস্থানের পেছনে নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে ডিবি স্টিক দিয়ে আমাকে এলোপাতাড়ি আঘাত ও কিল-ঘুষি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করে। এরপর হামলাকারীরা আমার সাথে থাকা নগদ ১১ হাজার টাকা এবং ৩০ হাজার টাকা মূল্যের একটি স্মার্টফোন ছিনিয়ে নেয়। পরবর্তীতে আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে একটি বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে আরও ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। ঘটনা জানাজানি করলে আমাকে হত্যার হুমকি দিয়ে চলে যায় অভিযুক্তরা। পরে পাবনা সদর থানায় অভিযোগ করেও তদন্তে কোন অগ্রগতি হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, সন্ধায় সহপাঠীকে নিয়ে টার্মিনাল হয়ে মেরিল বাইপাস দিয়ে টেবুনিয়ায় যাচ্ছিলাম মালাই চা খেতে। মেরিল বাইপাস পার হবার সময় কয়েকটি মোটরসাইকেল দেখলাম আমাদের ফলো করছে। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। তারপর হঠাৎ গাছপাড়া পার হবার পর জনমানবহীন অন্ধকারচ্ছন্ন একটি জায়গায় হঠাৎ তিনটা মোটরসাইকেল আমাদের রিক্সার সামনে এসে রিক্সার গতিরোধ করে। তারপর প্রায় ১২ জন মোটরসাইকেল থেকে নেমে আমাদের জিজ্ঞেস করে আমরা বিবাহিত কিনা। আমারা জানাই না আমরা বন্ধু। ঠিক তখনই আমাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে চড় থাপ্পর মেরে আমাদের জোড় করে রিক্সা থেকে নামায়। তারপর বলে পরিবারের কাছে ফোন দে। আজ মোটা একটা দান মারি। আমরা ভয়ে হাত পা জড়িয়ে ধরে অনেক রিকোয়েস্ট করার পর একজন আমাদের ফাঁকে নিয়ে এসে আমাদের কাছে নগদ টাকা মোবাইল সহ যা ছিল সব নিয়ে নেয়। তারপর ছেড়ে দিয়ে বলে, যা এবারের মত ছেড়ে দিলাম। আর এই ঘটনা কেউ যেন না জানে। জানলে কিন্তু তুই শেষ। মানসম্মানের ভয়ে পরে আমরাও বিষয়টা কাউকে বলতে পারিনি।

ভুক্তভোগী রিকশাচালক ও অটোচালকরাও একই অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য, রাতের বেলায় এই সড়কে চলাচল এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। অনেক চালকই জীবনের ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প পথ ব্যবহার করছেন, ফলে যাত্রীদেরও ভোগান্তি বাড়ছে।

এ বিষয়ে পাবনা সদর থানার ওসি মোঃ দুলাল হোসেন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে অভিযোগ পেয়েছি। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুতই ব্যবস্থা নেবো।

উল্লেখ্য, মেরিল বাইপাস–টেবুনিয়া সড়কটি পাবনা শহরের সঙ্গে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ এলাকার সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। সেখানে নিরাপত্তাহীনতা অব্যাহত থাকলে জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়বে—এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

(Visited 1,469 times, 1 visits today)

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *