তারেক খান: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ ও লাইক বাড়ানোর প্রতিযোগিতা এক নতুন ধরনের সামাজিক ও ডিজিটাল অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। ‘ভিউ বাণিজ্য’-এর নেশায় একদল অসাধু কনটেন্ট নির্মাতা রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পার্কে অবস্থানরত তরুণ-তরুণীদের ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত গোপনে ধারণ করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনুমতি ছাড়া এসব ভিডিও প্রকাশের ফলে ভুক্তভোগী ব্যাক্তি ও পরিবার যেমন চরম অপমানের মুখে পড়ছেন, তেমনি এটি আইনি দৃষ্টিতেও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা রানা ইকো পার্ক, পাবনা খালেক পার্ক, পাবনা মানসিক হাসপাতাল, ঈশ্বরদীর স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্ট, পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট সহ নির্জন স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে কিছু ব্যক্তি তরুণ-তরুণীর ব্যাক্তিগত মুহুর্ত মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে থাকে। পরবর্তীতে এসব ভিডিও ‘সচেতনতামূলক কনটেন্ট’ বা বিনোদনের আড়ালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া এমন ভিডিও ধারণ ও প্রচার দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং ভুক্তভোগীরা সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর আমি আর স্বাভাবিকভাবে ক্যাম্পাসে যেতে পারিনি। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি, পড়াশোনাতেও প্রভাব পড়েছে।”
এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই ভিউ-নির্ভর সংস্কৃতি আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ দুটোই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।”
সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এ.কে.এম শওকত আলী খানের মতে, এ ধরনের ঘটনার কারণে অনেক তরুণ-তরুণী সামাজিক চাপ ও অপমান সহ্য করতে না পেরে শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমায় ভুগছেন। কেবল আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার, নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে—এ ধরনের ভিডিওতে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার না করে বরং প্রতিবাদ জানানোর মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। এছাড়াও তরুণ-তরুণীদের আচরণে সংযম বজায় রাখা এবং চারপাশ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। যাতে এধরণের পরিস্থিতিতে তাদের পড়তে না হয়। সন্দেহজনক কোনো কার্যকলাপ চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত।
আইনজীবী অ্যাডঃ আশিক ফারহান বলেন, তরুণ-তরুণীদের আচরণে সংযম বজায় রাখা জরুরি। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা স্পষ্টতই অপরাধ। ভুক্তভোগীদের উচিত ভয় না পেয়ে আইনি সহায়তা নেওয়া। কেননা অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জা বা ভয় থেকে অভিযোগ করতে পিছপা হন, যার ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
পাবনা সদর থানার ওসি তারিকুল ইসলাম জানান, এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগ পেলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং অপরাধীদের শনাক্তে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
পাবনার সুশীল সমাজের মতে, দেশে আইনি কাঠামো থাকলেও প্রয়োগে ঘাটতি আছে। অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ ও প্রচার করা দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জা বা ভয় থেকে অভিযোগ করতে পিছপা হন, যার ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এছাড়া তরুণ-তরুণীদের আচরণে সংযম বজায় রাখাটা বেশি জরুরি। যাতে এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।
জনসাধারণের দাবি, পাবলিক প্লেসগুলোতে নজরদারি বাড়ানো এবং ‘ভিউ বাণিজ্য’-এর আড়ালে থাকা অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।