পাবনায় দাদিকে মে.রে নাতনিকে ধ.র্ষ.ণে.র পর হ.ত্যা.র রহস্য উদঘাটন

শেয়ার করুন

তারেক খান: নিশ্চুপ গ্রাম, গভীর রাত, হঠাৎ ভেসে আসা কান্নার শব্দ—আর তারপর আবার সব নিস্তব্ধ। কেউ তখন বুঝতে পারেনি, সেই নীরবতার আড়ালেই ঈশ্বরদীর ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামে ঘটে গেছে এক ভয়ংকর রক্তাক্ত অধ্যায়।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের এই গ্রামটিতে দাদি ও নাতনিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পাবনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। আটক হওয়া ট্রাকচালক শরিফুল ইসলাম শরীফ পুলিশের কাছে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত কর্মকর্তারা। ভয়াবহ এই ঘটনায় নিহত কিশোরীর চাচাই যে খুনি—এই তথ্য প্রকাশের পর পুরো এলাকায় নেমে আসে আতঙ্ক ও বিস্ময়।

নিহত সুফিয়া খাতুন (৬৫) ও তার নাতনি জামিলা আক্তার (১৫) গ্রামের একটি ছোট্ট বাড়িতে একসঙ্গেই থাকতেন। বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় দাদি-নাতনির সংসারটাই ছিল তাদের নিরাপদ আশ্রয়। জামিলা ছিল স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির ছাত্রী ও হাফেজা। তার বাবা কাজের প্রয়োজনে প্রায়ই ঢাকার সাভারে অবস্থান করতেন। ঘটনার রাতেও তিনি বাড়িতে ছিলেন না।

ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শরিফুল ইসলাম শরীফ যে বর্ণনা দিয়েছে, তা শোনার পর তদন্তকারীরাও শিউরে উঠেছেন। সে জানিয়েছে, কয়েকদিন আগে বাজার পৌঁছে দেওয়ার অজুহাতে সে জামিলাদের বাড়িতে যায়। সে সময় সুফিয়া খাতুন বাড়িতে না থাকার সুযোগে কিশোরীকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করে। কিন্তু জামিলা প্রতিবাদ করে, তাকে চড় মারে। সেই মুহূর্তের অপমান শরীফের ভেতরে আগুনের মতো জ্বলে ওঠে।

এই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে সে আবার ওই বাড়িতে হাজির হয়। আগের ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইতে গেলে সুফিয়া খাতুন চিৎকার শুরু করেন। মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ক্ষোভে অন্ধ হয়ে ওঠা শরীফ পাশেই পড়ে থাকা একটি কাঠের বাটাম দিয়ে বৃদ্ধার মাথায় আঘাত করে। এক আঘাতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সুফিয়া খাতুন। নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেও সে থামেনি।

দাদির ওপর হামলা দেখে জামিলা চিৎকার শুরু করলে শরীফ এবার কুন্নি দিয়ে তার মাথা ও কপালে আঘাত করে। আহত ও আতঙ্কিত কিশোরী মাটিতে পড়ে গেলে তাকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির পাশের সরিষা ক্ষেতে নিয়ে যায় সে। মাঝপথে পুকুরপাড়ে নিয়ে জামিলাকে ধর্ষণ করে এবং পরে গলা টিপে মৃত্যু নিশ্চিত করে। নিথর দেহটি সরিষাক্ষেতে ফেলে রেখে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে যায় সে।

সেই রাতেই গ্রামে কেউ কেউ কান্নার শব্দ শুনে বেরিয়ে এলেও পরে সব শান্ত দেখে ফিরে যান। কিন্তু ভোরের আলো ফুটতেই ভয়াবহ সত্য সামনে আসে। বাড়ির উঠানে পড়ে থাকতে দেখা যায় সুফিয়া খাতুনের রক্তাক্ত মরদেহ। নাতনিকে না পেয়ে স্বজনরা ছুটোছুটি শুরু করলে কিছু দূরের সরিষা ক্ষেতে পাওয়া যায় জামিলার বিবস্ত্র নিথর দেহ। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো এলাকা।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। প্রথম থেকেই কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন কর্মকর্তারা। এরপরই মাঠে নামে ডিবির একটি বিশেষ দল। স্থানীয় তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় শনিবার রাত ১০টার দিকে ভবানীপুর উত্তরপাড়া এলাকা থেকে শরিফুল ইসলাম শরীফ ও রাব্বি মন্ডল নামে দুজনকে আটক করা হয়। ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে শরীফ নিজের অপরাধ স্বীকার করে।

ডিবির ওসি রাশিদুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের পুরো বিবরণ শরীফ নিজেই দিয়েছেন। এ ঘটনায় নিহত জামিলার বোন বাদী হয়ে ঈশ্বরদী থানাতে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেছেন।

ঘটনার পর রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশ-এর অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার মো. শামীম হোসেন এবং পাবনার পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত বিচার ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির আশ্বাস দেন।

যে বাড়িতে একসময় দাদি-নাতনির নির্ভরতার জীবন চলত, সেখানে এখন শুধু রক্তের দাগ আর নিঃসঙ্গতা। আপনজনের হাতেই যে এমন ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে—এই প্রশ্নটাই এখন ঈশ্বরদীর বাতাসে ভাসছে, আতঙ্ক হয়ে, শোক হয়ে।

(Visited 1,411 times, 250 visits today)

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *