তারেক খান: পাবনার চাটমোহরে মাত্র ১২০ টাকা চুরির অপবাদকে কেন্দ্র করে মারধর, খুঁটিতে বেঁধে নির্যাতন এবং সেই অপমান সইতে না পেরে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মানবিকতা ও বিবেককে নাড়া দেওয়া এই ঘটনাটি ঘটেছে শুক্রবার (৮ মে) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে উপজেলার নিমাইচড়া ইউনিয়নের চিনাভাতকুর গ্রামে।
নিহত কিশোরীর নাম শ্রাবন্তী খাতুন। তিনি ওই গ্রামের দিনমজুর আলতাব হাসানের মেয়ে।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের বরাতে জানা গেছে, প্রায় এক বছর ধরে প্রতিবেশী হান্নান মোল্লার বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন শ্রাবন্তী। ঘটনার দিন সকালে হান্নান মোল্লার ঘরের আলমারির ড্রয়ার থেকে ১২০ টাকা হারিয়ে গেলে সন্দেহের তীর যায় কিশোরীটির দিকে। অভিযোগ রয়েছে, এরপর হান্নান মোল্লা ও তার স্ত্রী রুবিয়া খাতুন শ্রাবন্তীকে মারধর করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে তার দুই হাত রশি দিয়ে বেঁধে বাড়ির বারান্দার খুঁটির সঙ্গে আটকে রাখা হয় এবং লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে নির্যাতন। এ সময় তার কাছ থেকে টাকা চুরির স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় কয়েকজন ওই ঘটনার ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করেছেন বলেও জানা গেছে।
পরিবারের দাবি, সামান্য টাকার জন্য প্রকাশ্যে এমন অপমান ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে শ্রাবন্তী। পরে বাড়ি ফিরে সবার অগোচরে নিজ ঘরের ডাবরের সঙ্গে রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে সে।
ঘটনার সময় নিহতের বাবা-মা বাড়িতে ছিলেন না। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে তারা এসে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা আলতাব হাসান বাদী হয়ে হান্নান মোল্লা, তার স্ত্রী রুবিয়া খাতুনসহ আরও দুইজনকে আসামি করে চাটমোহর থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হান্নান মোল্লা (৪৫)-কে আটক করেছে পুলিশ। তিনি একই গ্রামের মৃত রিয়াজ উদ্দিন মোল্লার ছেলে।
নিহতের মামা সিফাত হাসান বলেন, “একটি সামান্য টাকার জন্য একটি শিশুকে অমানবিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। এই অপমান সইতে না পেরে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। আমরা জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
চাটমোহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা বলেন, “ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত হান্নান মোল্লাকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মাত্র ১২০ টাকার অভিযোগে একটি কিশোরীর প্রাণ ঝরে যাওয়ার এই ঘটনা আবারও সমাজে মানবিক মূল্যবোধের ভয়াবহ অবক্ষয়ের চিত্র সামনে এনে দিয়েছে। বিচারহীনতা, অমানবিক আচরণ ও জনসম্মুখে অপমান— এসবই যেন ধীরে ধীরে সমাজকে আরও নিষ্ঠুর করে তুলছে।