গানে গানে অমর পাবনার সন্তান গৌরী প্রসন্ন মজুমদার: ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

শেয়ার করুন

।। এবিএম ফজলুর রহমান।।

“একজন গীতিকার বেঁচে থাকেন তাঁর গানে”এই কথাটি যেন সবচেয়ে বেশি সত্যি হয়ে ওঠে পাবনার সন্তান গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ক্ষেত্রে। চার দশক পেরিয়ে গেছে তাঁর চলে যাওয়ার পর। কিন্তু সময়ের ¯্রােত তাঁর গানকে মুছে দিতে পারেনি। বরং দিন যত গড়িয়েছে, তাঁর লেখা গান ততই গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে বাঙালির হৃদয়ে।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার ছিলেন খ্যাতনামা উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও কোলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক। মা সুধা মজুমদার ছিলেন শিক্ষিত ও সাহিত্যপ্রেমী; কবিতা ও প্রবন্ধ লেখার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই গৌরীপ্রসন্নের বেড়ে ওঠার পরিবেশ ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধ।

ছোটবেলা থেকেই গান ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। বাড়িতে নিয়মিত গ্রামোফোনে গান শুনতেন। পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চাও ছিল। ছাত্রজীবনেই তাঁর লেখালেখির প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। এমনকি কালিদাসের ‘মেঘদূত’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন বলেও জানা যায়।

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় যান এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে বাংলা ও ইংরেজি দুই বিষয়েই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
গৌরীপ্রসন্নের সংগীতজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো শচীন দেববর্মনের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। কলেজজীবনে তিনি শচীন দেববর্মনের কাছে গিয়ে নিজের লেখা গান গাওয়ার সুযোগ চেয়েছিলেন। শচীনকর্তা তাঁর প্রতিভা বুঝতে পেরে গান গাওয়ার সুযোগ দেন, তবে পড়াশোনা শেষ করার শর্তও দিয়েছিলেন। এভাবেই ধীরে ধীরে গৌরীপ্রসন্নের গীতিকার হিসেবে পথচলা শুরু হয়।

পরবর্তীকালে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের বহু বিশিষ্ট সুরকার ও শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেন। শচীন দেববর্মন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমারসহ বহু শিল্পীর কণ্ঠে তাঁর লেখা গান জনপ্রিয়তা পায়।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গানের সংখ্যা বিপুল। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে প্রেমের গান, বিরহের গান, জীবনমুখী গান এবং চলচ্চিত্রের জন্য লেখা অসংখ্য জনপ্রিয় গান।
তাঁর অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই” যে গানটি বাঙালির নস্টালজিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। এছাড়া “এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন”, “আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে”, “যদি কাগজে লেখো নাম”, “জীবন খাতার প্রতি পাতায়” সহ অসংখ্য গান তাঁর সৃষ্টিশীলতার সাক্ষ্য বহন করে।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। তাঁর জন্মভূমি ছিল পাবনা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি ভারতে চলে গেলেও বাংলাদেশের প্রতি তাঁর টান কখনো কমেনি।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর হৃদয়ে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কলম ধরেন এবং “মাগো ভাবনা কেন”-এর মতো গান রচনা করেন। এই গানগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মানুষের মনে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল। নিজেই এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের স্মরণীয় ঘটনা এবং গান লিখে তিনি জন্মভূমির প্রতি কিছুটা ঋণ শোধ করতে চেয়েছিলেন।
বাংলাদেশ সরকার তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা প্রদান করে ২০১২ সালে।
জীবনের শেষদিকে গৌরীপ্রসন্ন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৮৬ সালের মে মাসেও তিনি গান লিখেছেন। অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য তাঁকে বোম্বেতে নেওয়া হয়। জীবনের শেষ পর্যায়েও তিনি গান লেখা থেকে বিরত হননি। তাঁর শেষদিকের লেখা “এবার তাহলে আমি যাই, সুখে থাক ভালো থাক, মন থেকে এই চাই” গানটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। ২০ আগস্ট ১৯৮৬ সালে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রেমে, বিরহে, আনন্দে, বেদনায় কিংবা দেশপ্রেমের আবেগে জীবনের নানা বাঁকে আজও ফিরে আসে পাবনার সন্তান গৌরীপ্রসন্নের গান। তাঁর শব্দে মানুষ খুঁজে পায় নিজের গল্প, নিজের অনুভূতি, নিজের না-বলা কথাগুলো।

বাংলা গানের জগতে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর কলমে শব্দ কখনো নিছক শব্দ হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে অনুভূতির ভাষা। মানুষের মনের গোপন কথাগুলো তিনি এমন সহজ, সাবলীল ও মায়াময় করে গানে তুলে ধরেছেন যে, তাঁর বহু সৃস্টি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।

গৌরীপ্রসন্নের গীতিকবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সহজিয়া আবেগ। শব্দের ভারে গানকে ভারাক্রান্ত না করে তিনি মানুষের চেনা অনুভূতিগুলোকে দিয়েছেন কাব্যিক রূপ। প্রেমিক-প্রেমিকার অভিমান, ভালোবাসার আকুলতা, বিচ্ছেদের হাহাকার, নিঃসঙ্গতার দীর্ঘশ্বাস, জীবনের টানাপোড়েন কিংবা দেশের প্রতি গভীর মমত্ব সবই তাঁর গানে পেয়েছে স্বতন্ত্র প্রকাশ।

তাঁর গান শুনলে মনে হয়, এ যেন কোনো অচেনা মানুষের গল্প নয় এ আমাদেরই গল্প। আমাদের আনন্দ, আমাদের কান্না, আমাদের ভালোবাসা, আমাদের হারানোর বেদনা।
আর এখানেই গৌরীপ্রসন্নের সাফল্য। তিনি শুধু গান লেখেননি; তিনি মানুষের অনুভূতিকে শব্দে বন্দী করেছেন।
গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলা আধুনিক গানের এক গৌরবময় অধ্যায়। সুরকার ও শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর সৃজনশীল মেলবন্ধন বাংলা গানের ভান্ডারকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।

তাঁর লেখা বহু গান শ্রোতাদের কাছে পেয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। কিন্তু জনপ্রিয়তার চেয়েও বড় বিষয় সময়ের পরীক্ষায় তাঁর গান টিকে আছে।

তাঁর গানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কথা ও সুরের গভীর মেলবন্ধন। গানের কথাগুলো যেন সুরের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। শব্দের ভেতর তিনি তৈরি করতেন ছন্দ, আবেগ, দৃশ্যকল্প ও অনুভূতির এমন এক জগৎ, যা সুর পেলে পূর্ণতা লাভ করত। এই কারণেই তাঁর গান কেবল শোনা যায় না—অনুভবও করা যায়।

গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের সৃষ্টির পরিধি প্রেম ও বিরহে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশ ও মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসাও তাঁর গানে শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময় তাঁর দেশাত্মবোধক গান মানুষের মনে সাহস, আবেগ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সেই সময়ে গান হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী ভাষা। আর সেই ভাষাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে গৌরীপ্রসন্নের অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে।
তাঁর দেশপ্রেমের গানগুলোতে ছিল মাটির গন্ধ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং স্বাধীনতার আকাংখা। তাই সেসব গান কেবল একটি সময়ের দলিল হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে বাঙালির আবেগ ও চেতনার অংশ।

সময় বদলায়। প্রজন্ম বদলায়। বদলে যায় গানের ধরন, সুরের ব্যবহার, শ্রোতার রুচি। কিন্তু মানুষের মৌলিক অনুভূতিগুলো বদলায় না।

ভালোবাসা আজও আছে, বিরহ আজও আছে, প্রিয়জনকে হারানোর কষ্ট আজও আছে, দেশকে ভালোবাসার অনুভূতিও আজও অমলিন। আর মানুষের এই চিরন্তন অনুভূতিগুলোই গৌরিপ্রসন্নের গানের প্রাণ।

তাই চার দশক পরও তাঁর গান পুরোনো হয়ে যায়নি। নতুন প্রজন্ম তাঁর গান শুনছে, শিল্পীরা নতুন করে পরিবেশন করছেন, সংগীতপ্রেমীরা তাঁর সৃষ্টিকে ফিরে ফিরে আবিষ্কার করছেন। সময়ের পরিবর্তন তাঁর গানকে ম্লান করেনি; বরং নতুন সময়ের কাছে নতুন অর্থে হাজির করেছে।

একজন শিল্পীর শারীরিক মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির মৃত’্য নয়। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

তিনি নেই কিন্তু তাঁর গান আছে।
তিনি নেই কিন্তু তাঁর শব্দ আছে।
তিনি নেই কিন্তু তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে তিনি আজও কথা বলেন।

তাঁর ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা তাই শুধু একজন প্রয়াত গীতিকারকে স্মরণ করা নয়; এটি বাংলা গানের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা জানানো।
তিনি নেই, তাঁর গান আছে।
আর সেই গানেই তিনি চিরজীবী।

 

লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, সাবেক সভাপতি, পাবনা প্রেসক্লাব ও স্টাফ রিপোর্টার, সমকাল, পাবনা অফিস।

(Visited 17 times, 1 visits today)

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *