তারেক খান: সাত দিন নিখোঁজ থাকার পর জলাশয়ে মিলল ১০ বছরের শিশু কামরুন্নাহার কলির বস্তাবন্দি মরদেহ। এর আগে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে আলোচনায় এসেছে তমা খাতুনের মৃত্যু; প্রাণ হারিয়েছে নয় বছরের হাফসা, ১৫ বছরের জামিলা ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়া খাতুনও। একের পর এক এমন ঘটনায় শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে পাবনায়। পাবনাবাসীর এখন প্রশ্ন—শিশুদের সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, আর অপরাধের পর বিচার নিশ্চিত হচ্ছে কতটা?
২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলুনিয়া গ্রামের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলি নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে তার বস্তাবন্দি খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তদন্তসংক্রান্ত বক্তব্যের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগের খবর প্রকাশিত হয়। পরে ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার আসামিদের বাড়িতে বিক্ষুব্ধ জনতার ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। শিশুটির মৃত্যু ঘিরে শোকের পাশাপাশি সামনে আসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন।
এর আগেও পাবনায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে একাধিক হত্যাকাণ্ড। ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর আটঘরিয়ার ষাটগাছা গ্রামে ১৬ বছর বয়সী তমা খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় প্রধান আসামি করা হয় সাবেক ইউপি সদস্য আদম আলীকে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত সংবাদে অভিযোগ ওঠে, জামিনে মুক্তির পর তিনি নিহতের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছিলেন এবং তমার বাবা নিরাপত্তাহীনতায় এলাকা ছেড়ে ছিলেন। ৭ সেপ্টেম্বর আদম আলী নিজেও গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন। তবে তাঁর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তমা মামলার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ।
২০২৫ সালের নভেম্বরে পাবনা শহরের শালগাড়িয়া সরদারপাড়া এলাকায় নয় বছর বয়সী হাফসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগের কথা জানায় এবং তিনজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামে ৬৫ বছর বয়সী সুফিয়া খাতুন ও তাঁর ১৫ বছর বয়সী নাতনি জামিলা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল, নাতনিকে অপহরণে বাধা দেওয়ায় দাদিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে এবং কিশোরীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। সে সময় প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত মামলার তথ্যও নিশ্চিত হয়নি বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল।
একই বছরের জুনে পাবনা সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নের পদ্মা নদী থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়া খাতুনের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে আসামি গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। পরে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজনের মৃত্যু হয়। একটি হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিশোধমূলক সহিংসতা কীভাবে আরও প্রাণহানির কারণ হতে পারে, ঘটনাটি তারও ভয়াবহ উদাহরণ।
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পাশাপাশি উদ্বেগ রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়েও। মাদক, সন্ত্রাস, মব সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তারা জড়িয়ে পড়ছে। সুজানগরের একটি দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলার সংবাদে স্থানীয়ভাবে ‘কিশোর গ্যাং’ হিসেবে পরিচিত একটি গোষ্ঠীর প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। যার শিকার হয়েছিল ৮ম শ্রেণির এক ছাত্রী।
ঘটনাগুলো পৃথক; প্রতিটির তদন্ত ও বিচারিক অবস্থাও এক নয়। তবু এসব মৃত্যু সামনে এনেছে কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন—শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত অনুসন্ধান কতটা কার্যকর? অপরাধের অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত হচ্ছে কি? ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীরা নিরাপত্তা পাচ্ছেন কি? আর শিশুদের ঝুঁকি কমাতে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজেরও দায় রয়েছে। অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ এবং প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিটি মামলার অগ্রগতি, দায়ীদের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপ এবং শিশু সুরক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা জনসমক্ষে তুলে ধরাও জরুরি।
এ বিষয়ে পাবনার সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. একেএম শওকত আলী খান জানান, শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সর্বপ্রথম পারিবারিক সচেতনতা ও সন্তানের সার্বক্ষণিক নজরদারি আবশ্যক। এ ছাড়া পারিবারিক শিক্ষার সম্প্রসারণের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশাসন ও সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
এ বিষয়ে পাবনা সদর থানার ওসি মো. তারিকুল ইসলাম জানান, প্রতিটি মামলার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছি এবং স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সচেষ্ট।
কলি, তমা, হাফসা, জামিলা ও রিয়ার ঘটনা কেবল কয়েকটি মৃত্যুর সংবাদ নয়; এগুলো শিশু সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ের কঠিন পরীক্ষা। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত, বিচার ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—সেসব প্রশ্নের উত্তর তথ্য, তদন্তের অগ্রগতি এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে দেওয়া। প্রশ্নটি থেকেই যায়, শিশুদের জন্য কতটা নিরাপদ পাবনা, আর তাদের সুরক্ষায় কার্যকর পরিবর্তন আনতে আর কত ঘটনার অপেক্ষা?