ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতি ও আন্দোলন-সংগ্রামের গৌরবময় অধ্যায় নিয়ে এগিয়ে চলেছে পদ্মা-যমুনাবিধৌত জনপদ
পাবনার কণ্ঠ ডেস্ক:
ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আন্দোলন-সংগ্রামের গৌরবময় অধ্যায় বুকে ধারণ করে ১৯৮ বছরে পদার্পণ করেছে দেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা পাবনা। আজ ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার, জেলার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৮২৮ সালের ১৬ অক্টোবর স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে পাবনা। প্রায় দুই শতাব্দীর পথপরিক্রমায় শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে ঐতিহ্যবাহী এই জনপদ।
জেলার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাবনা প্রেসক্লাব, ‘আজকের প্রজন্ম ফোরাম’সহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচির কথা জানা গেছে। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য স্মরণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে পাবনার গৌরবময় অতীত তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
যেভাবে গঠিত হয় পাবনা জেলা
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৯০ সালের দিকে বর্তমান পাবনা জেলার অধিকাংশ এলাকা তৎকালীন রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই সময়ে এ অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, গ্রামাঞ্চলে ডাকাতদের তৎপরতা এবং চলনবিল এলাকায় জলদস্যুদের উপদ্রব প্রশাসনিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে ১৮২৮ সালে পাবনায় জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। একই বছরের ১৬ অক্টোবর পাবনাকে স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৩২ সালে জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটের পরিবর্তে ডেপুটি কালেক্টর নিয়োগের মাধ্যমে জেলার প্রশাসনিক কাঠামো আরও সুসংহত হয়।
বিভিন্ন সময়ে জেলার সীমানায় পরিবর্তন এসেছে। ১৮৫৫ সালে ময়মনসিংহ জেলা থেকে সিরাজগঞ্জ থানাকে পৃথক করে পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ পৃথক জেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
রেল যোগাযোগ ও নগরজীবনের বিকাশ
পাবনার ইতিহাসে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রেল যোগাযোগের প্রসার, সড়কপথের বিকাশ এবং মোটরযান চলাচলের সূচনা এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। ১৮৭৮ সালের ১৯ জানুয়ারি ঈশ্বরদী এলাকায় রেলপথ স্থাপনের তথ্য স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে মোটর সার্ভিসের প্রচলন এবং পাবনা শহরে রিকশার বিস্তার নগরজীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন জনপদের মধ্যে মানুষের যাতায়াত সহজতর হয়। ঈশ্বরদীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধিতেও যোগাযোগব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে।
আন্দোলন-সংগ্রামে পাবনার গৌরবময় ইতিহাস
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে পাবনার মানুষের অংশগ্রহণ জেলার ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। অধিকার আদায়, সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের নানা সংগ্রামে এ অঞ্চলের মানুষের ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ের জুলাই আন্দোলনও জেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে মানুষের অংশগ্রহণ পাবনার সামাজিক সচেতনতা ও অধিকারবোধের পরিচয় বহন করে।
শিল্প-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ জনপদ
একসময় পাবনা ছিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। হোসিয়ারি শিল্প, তাঁত, কাঁচি, বেনারসি ও কাতানসহ বিভিন্ন শিল্পের জন্য এ জেলার পরিচিতি রয়েছে। এসব শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিকাশের ইতিহাস।
কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সংরক্ষণ ও আধুনিকায়ন সম্ভব হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পাবনা নামের উৎপত্তি নিয়ে নানা মত
পাবনা নামের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে একাধিক মত প্রচলিত রয়েছে। ইতিহাসবিদ রাধারমণ সাহা তাঁর ‘পাবনা জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থে পদ্মার অববাহিকার ‘পাবনী’ নামের সঙ্গে পাবনার নামকরণের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানা যায়।
অন্য একটি মত অনুসারে, ফরাসি শব্দ ‘পানবহ’—যার অর্থ তুলা বা তুলাজাত দ্রব্য—থেকে পাবনা নামের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে। এ অঞ্চলে তাঁত ও বস্ত্রশিল্পের ঐতিহ্য থাকায় কেউ কেউ এ ব্যাখ্যার পক্ষে মত দেন।
এ ছাড়া প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন জনপদ, ‘পদুবম্বা’ নামের একটি সামন্তরাজ্য কিংবা ‘পবন’ নামের এক কিংবদন্তিতুল্য দস্যুর নামের সঙ্গে পাবনার নামকরণের সম্পর্ক রয়েছে বলেও বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। তবে এসব ব্যাখ্যার কোনোটিই সর্বসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে পাবনা নামের প্রকৃত উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের সুযোগ এখনো রয়েছে।
নয় উপজেলা নিয়ে বর্তমান পাবনা
বর্তমানে পাবনা জেলা রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত। পাবনা সদর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, চাটমোহর, ফরিদপুর, সুজানগর, বেড়া, সাঁথিয়া ও ভাঙ্গুড়া—এই নয়টি উপজেলা নিয়ে জেলাটি গঠিত। পদ্মা ও যমুনা নদীঘেঁষা ভৌগোলিক অবস্থান, কৃষি, ঐতিহ্যবাহী শিল্প এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এ জেলার স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণই হোক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অঙ্গীকার
পাবনার ১৯৮ বছরের ইতিহাস কেবল একটি প্রশাসনিক জেলার বয়সের হিসাব নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, সাংস্কৃতিক বিকাশ, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এবং রাজনৈতিক সচেতনতার দীর্ঘ ইতিহাস। সময়ের পরিবর্তনে জেলার সামনে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রেও রয়েছে কাজের সুযোগ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মের কাছে গৌরবময় অতীত তুলে ধরা এবং সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যাশাই হয়ে উঠতে পারে পাবনাবাসীর সম্মিলিত অঙ্গীকার।