পাবনায় নেই পরিকল্পিত সড়ক, ড্রেনেজ, রোড লাইট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: আধুনিক শহরের দাবি পাবনাবাসীর

শেয়ার করুন

তারেক খান: বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা এবং দেশের অন্যতম পুরোনো পৌরসভা পাবনা। ১৮২৮ সালে জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাবনার বয়স প্রায় দুইশত বছর হতে চললো এবং ১৮৭৬ সালে পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পার হয়েছে দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়। অথচ আধুনিক নগর সুবিধার অনেক ক্ষেত্রেই এখনও পিছিয়ে রয়েছে জেলা শহরটি। যেখানে পার্শ্ববর্তী রাজশাহী, কুষ্টিয়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া শহরে আধুনিক সড়ক, উন্নত ড্রেনেজ, এলইডি রোড লাইট এবং ঘরে ঘরে বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাসহ পরিকল্পিত নগরসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে, সেখানে পাবনার বাসিন্দারা এখনও ভাঙাচোরা সড়ক, জলাবদ্ধতা, অন্ধকার সড়ক এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।

শহরের সদর হাসপাতাল সড়ক, মুজাহিদ ক্লাব সড়ক, মেডিকেল কলেজ সড়ক ও মানসিক হাসপাতাল সড়কসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশাপাশি অসংখ্য এলাকার অলিগলির অবস্থাও বেহাল দশা। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও উঠে গেছে কার্পেটিং। বর্ষা মৌসুমে গর্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। বছরের পর বছর সংস্কারের দাবি উঠলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

রিকশাচালক সেলিম বলেন, সারাদিন শহরের বিভিন্ন সড়কে চলাচল করি। অনেক জায়গায় রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে যাত্রী নিয়ে নিরাপদে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষায় গর্ত দেখা যায় না, তখন দুর্ঘটনার ভয় আরও বেড়ে যায়।

সড়কের পাশাপাশি অপরিকল্পিত ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থাও নগরবাসীর বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকায় দুর্ভোগে পড়েন পথচারী ও ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ী বিপুল বলেন, বৃষ্টি হলেই দোকানের সামনে পানি জমে যায়। অনেক সময় পানি নামতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগে। এতে ক্রেতা কমে যায়, ব্যবসায়ও ক্ষতি হয়।

আধুনিক শহরের অন্যতম অনুষঙ্গ পর্যাপ্ত সড়কবাতি বা রোডলাইট। অথচ পাবনা শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অনেক আবাসিক এলাকা ও অলিগলিতে পর্যাপ্ত রোড লাইট নেই। কোথাও বাতি নষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন পড়ে আছে, আবার কোথাও এখনো রোড লাইটই বসানো হয়নি। ফলে সন্ধ্যার পরই অনেক সড়ক অন্ধকারে ডুবে যায়। এতে নারী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের চলাচল যেমন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তেমনি সাপ-পোকার উপদ্রব, ছিনতাই ও দুষ্কৃতকারীদের ভয়ও বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

পৌর শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, রাতে অনেক সড়কে চলাচল করতেই ভয় লাগে। অন্ধকারে ভাঙা রাস্তা দেখা যায় না। বর্ষাকালে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। দ্রুত শহরের সব প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে আধুনিক এলইডি রোড লাইট স্থাপন করা দরকার।

অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও পিছিয়ে রয়েছে পাবনা। পার্শ্ববর্তী অনেক জেলা শহরে নির্ধারিত সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু থাকলেও পাবনার অনেক এলাকায় এখনও সেই সেবা নিয়মিত পৌঁছেনি। ফলে সড়কের পাশে বা খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলে রাখার কারণে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং পরিবেশ দূষণ বাড়ছে।

পৌর শহরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সালেহা খাতুন বলেন, সময়মতো বর্জ্য অপসারণ না হলে দুর্গন্ধে বসবাসই কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে এসব বর্জ্য ড্রেনে গিয়ে পানি নিষ্কাশনেও সমস্যা সৃষ্টি করে।

সমাজ বিজ্ঞানি ড.এ.কে.এম শওকত আলী খান বলেন, খণ্ডিত উন্নয়ন দিয়ে একটি শহর আধুনিক হয় না। সড়ক, ড্রেনেজ, রোড লাইট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সবুজায়ন ও ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার কথা বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা জরুরি।

এ বিষয়ে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. ওবায়েদুল হক জানান, অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের উন্নয়নকাজের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে কাজ শুরু হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকার কারণে, এই মুহূর্তে আমরা রোডলাইটের সব চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। আর কোথাও বর্জ্য সমস্যা থাকলে তা আমাদের জানালে সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাবনাবাসীর দাবি, বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নয়; একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে জেলা শহরের প্রধান সড়ক চার লেনে উন্নীত করা এবং অন্যান্য সকল রাস্তা সংস্কার, সড়কবাতি এলইডি রোড লাইটের রূপান্তর, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সবুজায়ন সহ পুরো শহরকে আধুনিক ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। প্রাচীন ঐতিহ্যের শহর হিসেবে পাবনা যেন শুধু ইতিহাসের গৌরবেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং আধুনিক নাগরিক সুবিধায়ও দেশের অগ্রসর জেলা শহরগুলোর কাতারে স্থান করে নেয়—এটাই এখন সময়ের দাবি।

(Visited 36 times, 1 visits today)

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *