পাবনাকে শতভাগ মাদকমুক্ত করার অসমাপ্ত ও অভাবনীয় সফল অভিযানের মুখেই জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. ছুফি উল্লাহকে বদলি করা হয়েছে। পাবনায় যোগদানের মাত্র আড়াই মাসের মাথায় তাঁকে এই বদলির আদেশ দেওয়া হলো। গত ২১ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে বিশেষ পুলিশ সুপার হিসেবে সিআইডিতে বদলি করার আদেশ জারি করা হয়। এত অল্প সময়েই অভাবনীয় পরিবর্তন আনার পর এই আকস্মিক বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই সমগ্র পাবনা জেলাজুড়ে নেমে এসেছে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের ছায়া। অভিভাবক, সুশীল সমাজ, সচেতন নাগরিক ও তরুণ সমাজ—সব স্তরের মানুষ সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে এসপি ছুফি উল্লাহকে পাবনায় বহাল রাখার জোর দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র ও সচেতন মহলের মতে, পাবনার বিগত প্রায় ২০০ বছরের জেলা পুলিশের ইতিহাসে মাদকের বিরুদ্ধে এত ব্যাপক, জিরো টলারেন্স নীতিতে পরিচালিত, নিখুঁত ও সাহসী অভিযান আর কখনোই দেখা যায়নি। পাবনায় যোগদানের পর মাত্র আড়াই মাসের এই সংক্ষিপ্ত সময়েই এসপি মো. ছুফি উল্লাহর দূরদর্শী ও আপসহীন নেতৃত্বে জেলার আনাচে-কানাচে ঝটিকা অভিযান চালানো হয়। এতে প্রায় ১,৪০০ জন চিহ্নিত মাদকসেবী ও মূল কারবারিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা বড় বড় মাদক সিন্ডিকেট। পাবনার অভিভাবকরা বলছেন, “মাদকের ভয়াল থাবা থেকে নিজেদের সন্তানদের রক্ষা করতে বছরের পর বছর আমরা নীরবে কান্না করেছি। রাতের পর রাত দুশ্চিন্তায় জেগে থেকেছি। এসপি ছুফি উল্লাহ পাবনায় যোগদানের পর মাত্র আড়াই মাসে যে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তাতে আমরা বহু বছর পর শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছিলাম। নতুন আশার আলো দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু মাত্র আড়াই মাসের মাথায় তাঁর বদলির এই খবরে আমরা আবারও গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগের মধ্যে পড়ে গেলাম।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে উপসচিব তৌছিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত আদেশে চারজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে রদবদল করা হয়, যার ৩ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে এসপি মো. ছুফি উল্লাহর নাম। তবে পাবনাবাসীর মতে, যোগদানের মাত্র আড়াই মাসের মাথায় জেলা পুলিশ সুপারকে সরিয়ে দেওয়া হলে মাদকের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই ঐতিহাসিক লড়াই থমকে যাবে। মাদক কারবারিরা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এবং সুযোগ পেয়ে পুরো জেলাকে পুনরায় মাদকের আখড়ায় পরিণত করবে।
“একজন কর্মকর্তা যখন মাত্র আড়াই মাসে সততা ও সাহসের সাথে সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছেন, তখন এত দ্রুত তাঁকে সরিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আমাদের উদাত্ত আহ্বান—পাবনার জনস্বার্থে, তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে এবং মাদক নির্মূলের এই বিশাল ধারা অব্যাহত রাখতে এসপি ছুফি উল্লাহর বদলির আদেশ অবিলম্বে বাতিল করে তাঁকে পাবনাতেই বহাল রাখা হোক।”
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, মাদক নির্মূলে শুধু ঝটিকা অভিযানই যথেষ্ট নয়, অভিযানে সৃষ্ট ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সবচেয়ে জরুরি। এসপি ছুফি উল্লাহ যে ছক এঁকে মাদকের উৎস ও অর্থায়নের নেপথ্য হোতাদের ঘেরাও করেছিলেন, যোগদানের আড়াই মাসের মাথায় তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিলে বিগত সময়ের বিপুল সাফল্য হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা একাত্ম হয়ে বলছেন, জনস্বার্থ ও তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষার চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। গৃহীত এই ঐতিহাসিক অভিযানকে চূড়ান্ত সফলতায় পৌঁছে দিতে এবং পাবনাকে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও মাদকমুক্ত জেলায় রূপান্তর করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের উচিত এই স্বল্প সময়ে বদলি আদেশ দ্রুত প্রত্যাহার করা। পাবনার লাখো মানুষের আকুল আবেদন—‘জনস্বার্থে এসপি ছুফি উল্লাহকে পাবনায় রাখা হোক।’